আযানের পূর্বে সালাত ও সালাম দেওয়ার হুকুম
আল্লাহ তা‘য়ালা ইরশাদ করেনঃ
﴿إِنَّاللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمً﴾
-‘‘ নিশ্চয় আল্লাহ্ ও তার ফিরিশ্তাগণ দরূদ প্রেরণ করেন ওই নবীর প্রতি, হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তার প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করো। ’’
[সূরা আহযাব আয়াত নং ৫৬]
উক্ত আয়াতে প্রিয় নবী (ﷺ) কে সালাম দিতে বলা হয়েছে এখানে কোন সময়কে খাস বা নির্দিষ্ট করা হয়নি যে শুধু এক বা নির্দিষ্ট সময়েই নবীকে সালাম দিবে, বরং এ আয়াতে আম ব্যাপকতার প্রমাণ মিলে যে নবীজি (ﷺ)'র উপর দুরুদ সালাম পাঠ করার।
এ বক্তব্যের সমর্থনে হানাফী মাযহাবের অন্যতম ফকীহ, মুহাদ্দিস, আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (رحمة الله عليه) উক্ত আয়াত প্রসঙ্গে বলেনঃ
” اَنَّهُ تَعَالَى لَمْ يَوقُتْ ْ ذَلِكَ لِيشَمِلُ سَائِرُ الْاَوْقَات “
অর্থাৎঃ “ আল্লাহ তা‘য়ালা এখানে উক্ত আয়াতে কোন নির্দিষ্ট ওয়াক্ত বা সময় নির্ধারন করেন নি বরং সমস্ত সময় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। (অর্থাৎ যে কোন সময়ই দরূদ সালাম পড়া যাবে নিষেধাজ্ঞা সময় ব্যতীত)।’’
[মোল্লা আলী ক্বারীঃ শরহে শিফা, ২/১০৭ পৃষ্টা]
এ বিষয়ে আরো একটি হাদিস লক্ষ্য করুনঃ
عَنِ الطُّفَيْلِ بْنِ أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا ذَهَبَ ثُلُثَا اللَّيْلِ قَامَ فَقَالَ " يَا أَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا اللَّهَ اذْكُرُوا اللَّهَ جَاءَتِ الرَّاجِفَةُ تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ جَاءَ الْمَوْتُ بِمَا فِيهِ جَاءَ الْمَوْتُ بِمَا فِيهِ " . قَالَ أُبَىٌّ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أُكْثِرُ الصَّلاَةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلاَتِي فَقَالَ " مَا شِئْتَ " . قَالَ قُلْتُ الرُّبُعَ . قَالَ " مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ " . قُلْتُ النِّصْفَ . قَالَ " مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ " . قَالَ قُلْتُ فَالثُّلُثَيْنِ . قَالَ " مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ " . قُلْتُ أَجْعَلُ لَكَ صَلاَتِي كُلَّهَا . قَالَ " إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ.
হযরত উবাই ইবনু কা’ব (رَضِیَ اللّٰہُ تَعَالٰی عَنْہُ) থেকে বর্ণিতঃ ... আমি বললাম, “ দিনের সবটুকু সময় আপনার উপর দরুদ পাঠ করব। ” তিনি (ﷺ) বললেনঃ “ তাহলে তোমার চিন্তা-মুক্তির জন্য তাই যতেষ্ট হবে। ”
[তিরমিযীঃ ৪/২১৮ পৃষ্টা, হা/২৪৫৭]
[শুয়াবুল ঈমানঃ ৩/৮৫ পৃষ্টা, হা/১৪১৮]
তবে ফকীহগণ কিছু স্থানে দুরূদ সালাম পড়ার ব্যাপারে মাকরূহ বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (رَحۡمَۃُ اللّٰہ ِعَلَیہِ) লিখেন:
- تُكْرَهُالصَّلَاةُ عَلَيْهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - فِي سَبْعَةِ مَوَاضِعَ: الْجِمَاعِ، وَحَاجَةِ الْإِنْسَانِ، وَشُهْرَةِ الْمَبِيعِ وَالْعَثْرَةِ، وَالتَّعَجُّبِ، وَالذَّبْحِ، وَالْعُطَاس.
‘‘ সাত অবস্থায় নবীজী(ﷺ) এর উপর সালাত ও সালাম পাঠ করা মাকরূহ (তাহরীমী)। যথা: (১) স্ত্রী সহবাসকালে, (২) প্রস্রাব পায়খানার সময়, (৩) ব্যবসার মাল চালু করার সময়, (৪) হোচট খাওয়ার পর, (৫) যবেহ করার সময়, (৬) আশ্চর্য্যকর সংবাদ শ্রবণ করার সময়, (৭) এবং হাঁচি দেয়ার সময়। ’’
[ফতোয়ায়ে শামী: ১/৩৮৩ পৃষ্ঠা]
আরেকটু সামনে গিয়ে তিনি লিখেন:
” قَو ْلُهُوَ مُسْتَحَبَّةٌ فِي كُلِّ أَوْقَاتِ الْإِمْكَانِ. أَيْ حَيْثُ لَا مَانِعَ. “
-‘‘ নিষিদ্ধস্থান ব্যতীত প্রত্যেক যায়গায় রাসূল (ﷺ) এর উপর দরুদ-সালাম পাঠ করা মুস্তাহাব ’’
[ইবনে আবেদীন শামী: ফতোয়ায়ে শামী: ১/৫১৮ পৃষ্ঠা]
দেখতে পেলেন নিষিদ্ধস্থান ব্যাতিত সর্বাবস্থায় দরূদ-সালাম পড়া মুস্তাহাব। আর আযানের পূর্বের সময়টিতো নিষিদ্ধ সময় নয়। তাই এসময়ও দরূদ পড়া মুস্তাহাব।
আবার অনেকেই এ বলে ফিৎনা ছড়ায় যে, আযানের পূর্বে কিছু পড়া নিষেধ। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। হাদিসটি লক্ষ্য করুন:
عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنِ امْرَأَةٍ، مِنْ بَنِي النَّجَّارِ قَالَتْ كَانَ بَيْتِي مِنْ أَطْوَلِ بَيْتٍ حَوْلَ الْمَسْجِدِ وَكَانَ بِلاَلٌ يُؤَذِّنُ عَلَيْهِ الْفَجْرَ فَيَأْتِي بِسَحَرٍ فَيَجْلِسُ عَلَى الْبَيْتِ يَنْظُرُ إِلَى الْفَجْرِ فَإِذَا رَآهُ تَمَطَّى ثُمَّ قَال:َ « اللَّهُمَّ إِنِّي أَحْمَدُكَ وَأَسْتَعِينُكَ عَلَى قُرَيْشٍ أَنْ يُقِيمُوا دِينَك »َ قَالَتْ: ثُمَّ يُؤَذِّنُ قَالَتْ وَاللَّهِ مَا عَلِمْتُهُ كَانَ تَرَكَهَا لَيْلَةً وَاحِدَةً تَعْنِي هَذِهِ الْكَلِمَاتِ.
হযরত ওরওয়াহ বিন জুবাইর (رَضِیَ اللّٰہُ عَنْہُ) থেকে বর্ণিত: তিনি বানু নাজ্জারের এক মহিলা সাহাবী (رَضِیَ اللہُ عَنۡہَا) থেকে, তিনি বলেন: মসজিদে নববীর নিকটবর্তী ঘর সমূহের মধ্যে আমার বাড়ি সবচেয়ে উচু। হযরত বিলাল (رَضِیَ اللّٰہُ عَنْہُ) সেখানে উঠে ফজরের আযান দিতেন। তিনি সাহরীর সময় (শেষ রাতে) সেখানে এসে বসতেন এবং সুবহে সাদিকের জন্য অপেক্ষা করতেন। সুবহে সাদিক হয়ে গেলে তিনি শরীরের আড়মোড় ভেঙ্গে (বা হাই তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে) বলতেন: « اللَّهُمَّ إِنِّي أَحْمَدُكَ وَأَسْتَعِينُكَ عَلَى قُرَيْشٍ أَنْ يُقِيمُوا دِينَك » অর্থাৎ: “ হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসা করছি এবং কুরাইশদের ব্যাপারে আপনার কাছে সাহায্য চাইছি যেন তাদের দ্বারা আপনার দ্বীন কায়িম হয়। ” বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি আযান দিতেন। বর্ণনাকারী আরো বলেন, আল্লাহর শপথ কোন রাতেই আমি বিলাল (رَضِیَ اللّٰہُ عَنْہُ) কে এ কথাগুলো ত্যাগ করতে দেখিনি। ”
[সুনানে আবু দাউদ: ১/৭৭ পৃষ্ঠা, হাদিস: ৫১৯] [সুনানুল কুবরা: ১/৪২৫ পৃ, হাদিস:১৮৪৬]
সুতরাং প্রমাণিত হলো আযানের পূর্বে সালাত ও সালাম দেওয়া হারাম নয়; বরং মুস্তাহাব। দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে এখানেই ইতি টানলাম।

0 Comments